Blog Details

টিসিবি ডিলার অনুমোদন, নিয়োগ ও বাতিলে আইনগত করনীয়

টিসিবি ডিলার (TCB Dealer) কী? ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (TCB) আইনগতভাবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি রাষ্ট্রীয় বাণিজ্যিক সংস্থা। এই সংস্থার উদ্দেশ্য অর্জনে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজার স্থিতিশীল রাখা এবং নিম্নআয়ের সাধারণ মানুষের কাছে ভর্তুকি মূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পৌঁছে দেওয়ার জন্য যে সকল অনুমোদিত ব্যক্তি বা সংস্থাকে এলাকাভিত্তিক চুক্তিভিত্তিক প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়, আইনি ভাষায় তারাই টিসিবি ডিলার।

✅ডিলারের কাজ ও আইনি দায়বদ্ধতা:

মূল্য পরিশোধ ও পণ্য উত্তোলন:  বরাদ্দের ডিও (Delivery Order) অনুযায়ী পণ্যের নির্ধারিত মূল্য ডেলিভারির ১ দিন পূর্বে নির্দিষ্ট ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা দিয়ে সরকারি গুদাম হতে নিজ দায়িত্বে পণ্য গ্রহণ ও পরিবহন করা।

🔴নিরাপদ মজুদ: নিজস্ব বা ভাড়াকৃত অনুমোদিত দোকান/গুদামে (ন্যূনতম ১০ মেঃটন ধারণক্ষমতা সম্পন্ন পাকা মেঝেযুক্ত) খাদ্যপণ্য সম্পূর্ণ নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে সংরক্ষণ করা।

🔴সঠিক বিতরণ (স্মার্ট পদ্বতি): জেলা প্রশাসকের "বিক্রয় ক্যালেন্ডার" অনুসরণ করে নির্ধারিত স্থানে টিসিবি কার্ডধারী উপকারভোগীদের নিকট কার্ড স্ক্যান, বৃদ্ধাঙ্গুলির ছাপ (Biometric) বা নির্ধারিত ডিজিটাল পদ্ধতি যাচাই সাপেক্ষে সরকার নির্ধারিত ভর্তুকি মূল্যে পণ্য বিক্রয় করা।

🔴তদন্তে সহযোগিতা: বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, টিসিবি বা স্থানীয় প্রশাসনের (ট্যাগ অফিসার/ইউএনও) পরিদর্শনের সময় মজুদ রেজিস্টারসহ সকল নথিপত্র বা রেকর্ড প্রদর্শন করতে ডিলার আইনত বাধ্য।

✅নিয়োগের এলাকা ও বিজ্ঞপ্তি (Jurisdiction & Notification)

 সাধারণ এলাকা: পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশন এলাকার প্রতি ওয়ার্ডের জন্য ১ জন এবং অন্যান্য অঞ্চলের প্রতি ইউনিয়নের জন্য ১ জন।

🔴বিশেষ ক্ষেত্র: যদি কোনো ওয়ার্ড বা ইউনিয়নে উপকারভোগী পরিবারের সংখ্যা ১৫০০ এর বেশি হয়, তবে স্থানীয় প্রশাসনের অধিক্ষেত্র নির্ধারণ সাপেক্ষে একাধিক ডিলার নিয়োগ করা যাবে।

🔴সাময়িক ও ট্রাকসেল: সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা বা উপজেলা পর্যায়ের তুলনামূলক দারিদ্র্যপীড়িত এলাকায় বিশেষ ভ্রাম্যমাণ ট্রাকসেল বা সাময়িক ডিলার নিয়োগ করা হয়।

✅বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ প্রক্রিয়া: 

ডিলার নিয়োগের জন্য দরখাস্ত আহ্বান করে বহুল প্রচারিত একাধিক জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি  প্রকাশ করতে হবে।
 
🔴এছাড়াও টিসিবি'র নিজস্ব ওয়েবসাইট tcb.gov.bd, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট এবং সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকের নোটিশ বোর্ডে এটি প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক।

🔴সাময়িক ডিলারের ক্ষেত্রে ৩ কার্যদিবস সময় দিয়ে শুধু টিসিবি ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়।

✅আবেদনের যোগ্যতা (Eligibility Criteria):

✅জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী বয়স ন্যূনতম ১৮ বছর এবং বাংলাদেশের বৈধ নাগরিক হতে হবে।

✅আবেদনের পূর্ববর্তী ৬ মাসের ব্যাংকিং লেনদেনের বিবরণীসহ ব্যাংকে ন্যূনতম ৫ (পাঁচ) লক্ষ টাকা আর্থিক সচ্ছলতার প্রমাণক থাকতে হবে।
 
✅সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন/ওয়ার্ডের স্থায়ী বা অস্থায়ী বাসিন্দা হতে হবে। বড় হাট/বাজারে ন্যূনতম ১০ মেঃটন পণ্য মজুদের সুবিধাসহ পাকা মেঝের নিজস্ব বা ভাড়াকৃত দোকান থাকতে হবে।

✅আবেদনকারীকে অবশ্যই একজন প্রকৃত মুদি ব্যবসায়ী হতে হবে এবং হালনাগাদ মুদি ব্যবসার ট্রেড লাইসেন্স থাকতে হবে।

✅আবেদনের অযোগ্যতা (Disqualifications):
 
✅সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, বেসরকারি চাকুরিজীবী, এমপিওভুক্ত শিক্ষক/কর্মচারী এবং নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিগণ।

✅আদালত কর্তৃক ফৌজদারি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তি।

✅টিসিবি বা অন্য কোনো সরকারি/স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান কর্তৃক কালো তালিকাভুক্ত (Blacklisted) ঠিকাদার, ডিলার বা সরবরাহকারী।

✅একই পরিবারের একাধিক সদস্য (পরিবার বলতে পিতা-মাতা, স্বামী-স্ত্রী, নির্ভরশীল ভাই-বোন, অবিবাহিত পুত্র-কন্যা বুঝাবে) বা একই ব্যক্তির নামে একাধিক ডিলারশীপ থাকলে তা অযোগ্য বলে গণ্য হবে।

✅আবেদন প্রক্রিয়া ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র (Application Procedure)

🔴টিসিবি'র নির্ধারিত ফরমে বা ভবিষ্যতে তৈরি হতে যাওয়া অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে আবেদন করতে হবে।

 🔴আবেদনের শর্তানুযায়ী সরাসরি, ডাকযোগে বা অনলাইনে চেয়ারম্যান, টিসিবি বরাবর আবেদন পাঠাতে হবে।

✅সংযুক্তব্য নথিপত্র (Required Documents Checklist):

>  সদ্য তোলা ২ কপি পাসপোর্ট সাইজের ছবি।
> >জাতীয় পরিচয়পত্র (NID)-এর কপি।
>   হালনাগাদ মুদি ব্যবসায়ী ট্রেড লাইসেন্সের কপি।
>  ব্যাংক সলভেন্সী সার্টিফিকেট (Bank Solvency Certificate)।
>  দোকান ভাড়ার চুক্তিপত্র বা মালিকানার দলিলের কপি।
>  ভ্যাট (VAT) নিবন্ধন সনদপত্র (যদি থাকে)।
>  টিসিবি'র অনুকূলে আবেদন ফি বাবদ ৫,০০০/- টাকার (অফেরতযোগ্য) পে-অর্ডার/ব্যাংক ড্রাফট।

✅যাচাই-বাছাই, সুপারিশ ও অনুমোদন (Scrutiny, Recommendation & Approval)

আইনি গাইডলাইন অনুযায়ী ডিলার নির্বাচনের প্রক্রিয়াটি ৪টি ধাপে সম্পন্ন হয়:
[ধাপ ১: প্রাথমিক বাছাই] ➔ টিসিবি সদর দপ্তর কর্তৃক আবেদন প্রাপ্তির শেষ তারিখ হতে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে।
         ↓
[ধাপ ২: সরেজমিন তদন্ত] ➔ জেলা প্রশাসক (DC) কর্তৃক পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে যাচাই ও সুপারিশ প্রেরণ (সর্বোচ্চ ৩ মাস)।
         ↓
[ধাপ ৩: চূড়ান্ত নির্বাচন] ➔ চেয়ারম্যানের সভাপতিত্বে ৩ সদস্যের উচ্চপর্যায়ের কমিটি কর্তৃক অনুমোদন।
         ↓
[ধাপ ৪: নিয়োগাদেশ]       ➔ চেয়ারম্যান, টিসিবি কর্তৃক চূড়ান্ত ডিলার নিয়োগপত্র জারি।

✅চুক্তি, মেয়াদকাল ও নবায়ন (Agreement, Validity & Renewal)

✅চুক্তি সম্পাদন (Contract & Security Deposit):জামানত: নির্বাচিত ডিলারকে ৫০,০০০/- টাকা (ফেরতযোগ্য) পে-অর্ডার হিসেবে জমা দিতে হবে।

🔴অঙ্গীকারনামা: ৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে নির্ধারিত শর্তাবলী সংবলিত লিগ্যাল আন্ডারটেকিং বা অঙ্গীকারনামা দিতে হবে।
 
🔴লাইসেন্স ফি: চুক্তি কার্যকরের জন্য ১০,০০০/- টাকা (অফেরতযোগ্য) লাইসেন্স ফি প্রদান করতে হবে।

 🔴বাধ্যবাধকতা: চুক্তির পূর্বে টিসিবি কর্মকর্তা কর্তৃক সরেজমিনে পরিদর্শনের সময় ডিলারকে দোকানে সশরীরে উপস্থিত থাকতে হবে।

✅মেয়াদকাল ও নবায়ন (Tenure & Renewal) 

ডিলারশীপের মেয়াদকাল সাধারণত ২ (দুই) বছর।

🔴মেয়াদ শেষ হওয়ার কমপক্ষে ০৩ মাস পূর্বে নবায়নের জন্য আবেদন করতে হবে।

🔴নবায়ন ফি প্রতি দুই বছরের জন্য ৫,০০০/- টাকা (অফেরতযোগ্য)।

🔴মেয়াদোত্তীর্ণের পর ১ মাস পর্যন্ত ১,০০০/- টাকা বিলম্ব ফি (Fine) প্রদান সাপেক্ষে নবায়নের সুযোগ থাকে, অন্যথায় ডিলারশীপ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হবে।

✅ডিলারশীপ বাতিল ও জামানত বাজেয়াপ্তকরণ (Cancellation & Forfeiture)

🔴নীতিমালার ১০ নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী চুক্তি ভঙ্গ বা নিম্নলিখিত আইনি ব্যত্যয়ের কারণে ডিলারশীপ সরাসরি বাতিল এবং জামানত বাজেয়াপ্ত হবে:

🔴অনুমতি ছাড়া দোকান পরিবর্তন করলে বা স্থায়ী/অস্থায়ী বাসস্থান সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন/ওয়ার্ড থেকে অন্য কোথাও স্থানান্তরিত করলে।

 🔴দাখিলকৃত কোনো কাগজপত্র বা দলিল জাল বা ভুয়া প্রমাণিত হলে। 
 
🔴ফৌজদারি মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত হলে বা সরকারি কর্মকর্তার সাথে অশোভন আচরণ বা অসত্য তথ্য প্রদান করলে।

🔴পণ্য কালোবাজারে বিক্রয়, বেশি দামে বিক্রয়, ওজনে কম দেওয়া বা কার্ডধারী ব্যতীত অন্য কারও কাছে বিক্রয় করলে।

🔴অকর্মণ্যতা (Non-performance):  বরাদ্দ পাওয়ার পর পর পর ২ বার পণ্য উত্তোলনে ব্যর্থ হলে বা অবৈধ মজুদ করলে।

🔴সরকারি/বেসরকারি চাকরিতে যোগদান করলে বা কোনো প্রকার ডিলার সমিতি/অ্যাসোসিয়েশন গঠন করলে।

✅আইনগত করনীয় : 
টিসিবি ডিলার নিয়োগ ও ব্যবস্থাপনা পুরোপুরি প্রশাসনিক ও চুক্তিভিত্তিক আইনের (Law of Contract) অধীন। কোনো ডিলারের ডিলারশীপ বাতিল বা নবায়ন না হলে নীতিমালার আলোকে নিম্নোক্ত আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া যায়। 

🔴ডিলারের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে জেলা প্রশাসন বা টিসিবি সরাসরি সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্বে ডিলারকে কারণ দর্শানোর নোটিশ (Show Cause Notice) এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের যৌক্তিক সুযোগ দিতে বাধ্য। এর ব্যত্যয় ঘটলে আইনি প্রক্রিয়াটি ত্রুটিপূর্ণ (Vitiated) বলে গণ্য হবে।

🔴যদি সরকারের কোনো সিদ্ধান্ত বা ডিলারশীপ বাতিলের আদেশ সম্পূর্ণ বেআইনি, এখতিয়ারবহির্ভূত বা মৌলিক অধিকার পরিপন্থী হয়, তবে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সুপ্রীম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়েরের মাধ্যমে আইনি প্রতিকার ও স্থগিতাদেশ (Stay Order) প্রার্থনা করতে পারেন।

টিসিবি'র ডিলার নিয়োগ ও ব্যবস্থাপনা নীতিমালা (সংশোধিত), ২০২৫ আলোকে প্রস্তুতকৃত। 

যেকোনো মতামত, সংশোধনী,  পরামর্শ প্রদান করতে পারেন। যাচাই-বাছাই পূর্বক সংশোধন করা হবে। 

অ্যাডভোকেট মনিরুল ইসলাম মিয়া