Blog Details

ভূমি অধিগ্রহণ (Land Acquisition) এর আইনি বিধান ও ধাপ সমূহ

ভূমি অধিগ্রহণ (Land Acquisition) এর আইনি বিধান ও ধাপ সমূহ : 

ভূমি অধিগ্রহণ (Land Acquisition) সাধারণ মানুষের জন্য জীবনের সবচেয়ে বড় ধাক্কাগুলোর একটি, আবার রাষ্ট্র বা সমাজের উন্নয়নের জন্য একটি অপরিহার্য আইনি প্রক্রিয়া। একজন আইনজীবীর দৃষ্টিকোণ থেকে ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ার মূল ভিত্তি হলো

—"রাষ্ট্র জনস্বার্থে যেকোনো নাগরিকের সম্পত্তি কেড়ে নিতে পারে (Eminent Domain), তবে আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তাকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিতে রাষ্ট্র বাধ্য।"

বাংলাদেশে বর্তমানে এই পুরো প্রক্রিয়াটি  স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও হুকুমদখল আইন, ২০১৭’ (The Acquisition and Requisition of Immovable Property Act, 2017) দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়।

আইনের সুনির্দিষ্ট ধারা (Sections) ও আদালতের বিষয়াদিসহ পুরো প্রক্রিয়াটি ধাপে ধাপে আলোচনা করা হলো:

১. কেন অধিগ্রহণ করা হয়? (The Purpose): 
আইনের ধারা ৪(১) অনুযায়ী, যদি কোনো স্থাবর সম্পত্তি "জনস্বার্থে" (Public Interest) বা "সরকারি উদ্দেশ্যে" প্রয়োজন হয় বা প্রয়োজন বলে প্রতীয়মান হয়, তবেই কেবল রাষ্ট্র তা অধিগ্রহণ করতে পারে। যেমন: রাস্তাঘাট, রেললাইন, ফ্লাইওভার, বিদ্যুৎকেন্দ্র, বা সরকারি আবাসন প্রকল্প।

২. কীভাবে অধিগ্রহণ করা হয়? (আইনি ধাপ ও সেকশনসমূহ):  একটি বৈধ ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়াকে প্রধানত ৭টি ধাপে ভাগ করা যায়:

ধাপ-১: ৪ ধারার নোটিশ (প্রাথমিক নোটিশ ও ভিডিওগ্রাফি): সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক (DC) যখন মনে করেন কোনো জমি জনস্বার্থে প্রয়োজন, তখন তিনি ৪ ধারার অধীনে একটি প্রাথমিক নোটিশ জারি করেন।

 গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: এই নোটিশ জারির পর ডিসি অফিস থেকে ওই জমির ওপর অবস্থিত ঘরবাড়ি, গাছপালা ও অবকাঠামোর ভিডিওচিত্র বা ডিজিটাল রেকর্ড (Joint List) তৈরি করা হয়।  ৪ ধারার নোটিশ হওয়ার পর ওই জমিতে নতুন কোনো স্থাপনা তৈরি করলে তার জন্য কোনো ক্ষতিপূরণ পাওয়া যায় না।

ধাপ-২: ৫ ধারার আপত্তি (Objection by the Owner):  কোনো জমির মালিকের যদি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে কোনো যুক্তিযুক্ত আপত্তি থাকে (যেমন: এটি একমাত্র বসতভিটা বা এখানে ধর্মীয় উপাসনালয় আছে), তবে নোটিশ প্রকাশের ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে ডিসির কাছে লিখিত আপত্তি জানাতে হবে।

 নিষ্পত্তি: জমির পরিমাণ ৫০ বিঘার কম হলে ডিসি নিজেই শুনানি করে এটি নিষ্পত্তি করবেন। ৫০ বিঘার বেশি হলে তিনি মতামতসহ প্রতিবেদন ভূমি মন্ত্রণালয়ে পাঠাবেন এবং সরকার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।

ধাপ-৩: ৭ ধারার নোটিশ (চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত)

৫ ধারার আপত্তি নিষ্পত্তি হওয়ার পর এবং সরকার জমি নেওয়ার ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিলে, জেলা প্রশাসক সংশ্লিষ্ট স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের (মালিক/উত্তরাধিকারী/দখলদার) ৭ ধারার নোটিশ দেন। এর মাধ্যমে সরকারকে জমি দেওয়ার বিষয়টি চূড়ান্ত হয় এবং ক্ষতিপূরণ দাবির আহ্বান জানানো হয়।

ধাপ-৪: বাজারমূল্য নির্ধারণক্ষতিপূরণের হার (Valuation): 
 ৪ ধারার নোটিশ জারির পূর্ববর্তী ১২ মাসের ওই এলাকার সমশ্রেণির জমির গড় সাব-রেজিস্ট্রি দলিলমূল্য বিবেচনা করে ডিসি জমির গড় বাজারমূল্য (Market Value) নির্ধারণ করেন।

 ক্ষতিপূরণের অবিশ্বাস্য নতুন হার (২০১৭ সালের আইন অনুযায়ী):
 
সরকারি বা PPP প্রকল্পের জন্য: বাজারমূল্যের ওপর অতিরিক্ত ২০০% ড্যামেজসহ মোট ৩ গুণ (৩০০%) টাকা।

বেসরকারি প্রকল্পের জন্য: বাজারমূল্যের ওপর অতিরিক্ত ৩০০% ড্যামেজসহ মোট ৪ গুণ (৪০০%) টাকা।
অবকাঠামো/গাছপালার জন্য: ঘরের মূল্য বা গাছের মূল্যের ওপর অতিরিক্ত ১০০% সহ মোট ২ গুণ (২০০%) টাকা।

ধাপ-৫: ধারার নোটিশঅ্যাওয়ার্ড (Award of Compensation): 
 
৯ ধারা অনুযায়ী ক্ষতিপূরণের হিসাব চূড়ান্ত করে জেলা প্রশাসক প্রত্যেক মালিকের নামে একটি আর্থিক বরাদ্দের নোটিশ দেন, যাকে আইনি ভাষায় "অ্যাওয়ার্ড" (Award) বলা হয়। এটি মূলত ক্ষতিপূরণের টাকা গ্রহণের চূড়ান্ত ডাক।

ধাপ-৬: ১১ ধারা অনুযায়ী দখল গ্রহণ (Taking Possession):সংশ্লিষ্ট মালিকদের ক্ষতিপূরণের টাকা পরিশোধ করার পর বা টাকা নেওয়ার জন্য নোটিশ দেওয়ার পর, জেলা প্রশাসক ওই সম্পত্তির দখল গ্রহণ করেন এবং গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জমিটি প্রত্যাশী সংস্থার (যেমন: ওয়াসা, রেলওয়ে, বা সড়ক বিভাগ) অনুকূলে সমর্পণ করেন। এর মাধ্যমেই জমির মালিকানা রাষ্ট্রের কাছে চলে যায়।

৩. আদালতে যাওয়ার বিষয়সমূহ (Litigation & Remedies): 
ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ায় সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্তি তৈরি হয় আদালত নিয়ে। অনেকে মনে করেন জমি অধিগ্রহণ করলেই সরাসরি দেওয়ানি আদালতে (Civil Court) মামলা করা যাবে। কিন্তু এখানে আইনের বিশেষ কিছু কড়াকড়ি রয়েছে।

ক. দেওয়ানি আদালতের নিষেধাজ্ঞা বা মামলার সীমাবদ্ধতা।
আইনের ৪৭ ধারা অনুযায়ী, এই আইনের অধীনে জেলা প্রশাসক বা সরকার কর্তৃক গৃহীত কোনো পদক্ষেপ বা আদেশের বিরুদ্ধে সাধারণ দেওয়ানি আদালতে কোনো মামলা (Suit) বা নিষেধাজ্ঞার (Injunction) আবেদন করা যাবে না। অর্থাৎ, সিভিল কোর্ট এখানে সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে পারে না।

 খ. ক্ষতিপূরণের পরিমাণ নিয়ে আপত্তি: আরবিট্রেটর: 
যদি আপনার জমির মালিকানা ঠিক থাকে, কিন্তু ডিসি অফিস যে ক্ষতিপূরণ (Award) নির্ধারণ করেছে তা যদি কম মনে হয় বা বাজারমূল্যের চেয়ে কম হয়, তবে আপনি আদালতে যেতে পারবেন।

সরকারের নিযুক্ত আরবিট্রেটর (Arbitrator) এর আদালতে আবেদন করতে হবে। সাধারণত একজন যুগ্ম জেলা জজ (Joint District Judge) এই দায়িত্ব পালন করেন
সময়সীমা: ধারা ৮ এর নোটিশ পাওয়ার বা টাকা গ্রহণের ৪৫ দিনের মধ্যে আরবিট্রেটরের নিকট আবেদন করতে হবে।

 অধিগ্রহণকৃত সম্পত্তির টাকা তোলার নিয়ম: অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ হলো—ডিসি অফিস থেকে ক্ষতিপূরণের টাকা তোলার সময় আপত্তি বা অনুযোগসহ (Under Protest)  টাকা তুলতে হবে। আপনি যদি কোনো আপত্তি ছাড়া টাকা তুলে নেন, তবে পরবর্তীতে আরবিট্রেটরের কাছে ক্ষতিপূরণ বাড়ানোর দাবি করার অধিকার হারাতে পারেন।

গ. আরবিট্রেটরের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল: ট্রাইব্যুনাল (ধারা ৩৬): আরবিট্রেটর (যুগ্ম জেলা জজ) যে রায় দেবেন, তাতেও যদি কোনো পক্ষ (মালিক বা ডিসি অফিস) অসন্তুষ্ট হয়, তবে উচ্চতর আদালতে যাওয়ার সুযোগ আছে। আরবিট্রেশন অ্যাপ্লিকেট ট্রাইব্যুনাল (Arbitration Appellate Tribunal) এ আপিল করতে হবে। জেলা জজ (District Judge) এই ট্রাইব্যুনালের বিচারক।

সময়সীমা: আরবিট্রেটরের আদেশের ৩০ দিনের মধ্যে এই আপিল দায়ের করতে হয়। এই ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য হয়।

ঘ. হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন (Writs in High Court): যদি জেলা প্রশাসক বা ভূমি মন্ত্রণালয় ২০১৭ সালের আইনের বিধান সম্পূর্ণ লঙ্ঘন করে (যেমন: ৪ ধারার নোটিশ না দিয়ে জমি দখল করা, ৫ ধারার শুনানি না দেওয়া, বা ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য জমি নেওয়া), তবে ক্ষতিগ্রস্ত নাগরিক সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন (Writ Petition)দায়ের করতে পারেন।

রিট করার মাধ্যমে পুরো অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ার ওপর হাইকোর্ট থেকে স্থগিতাদেশ (Stay Order) বা কারণ দর্শানোর নোটিশ (Rule Nisi) জারি করানো সম্ভব, যদি প্রমাণ করা যায় যে প্রক্রিয়াটি বেআইনি বা ক্ষমতার অপব্যবহার (Malafide) করে করা হয়েছে।